আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১৭:১৬

হাজার টাকা কেজির কাঁকড়া এখন বিক্রি হচ্ছে চার টাকা!

অনলাইন ডেস্ক
হাজার টাকা কেজির কাঁকড়া এখন বিক্রি হচ্ছে চার টাকা!

সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা উপকূলীয় অঞ্চলে চাষ করা ৮০ ভাগ জীবিত কাঁকড়া ও কুচে রপ্তানি হয়ে থাকে চীনে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে চীনে কাঁকড়া-কুচিয়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাতক্ষীরার উৎপাদিত কুচে ও কাঁকড়া রপ্তানি বানিজ্যে ধ্বস নেমেছে। এতে করে বিপাকে পড়েছে এখানকার চাষিরা।

গত দুই সপ্তাহ যাবৎ রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অসংখ্য খামারে কুচে-কাঁকড়ায় মড়ক দেখা দিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছে- এ অবস্থা চলতে থাকলে তারা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হবে। যৎসামান্য কাঁকড়া সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, ব্যাংকক, হংকং, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হলেও সেখানকার বাজারে এখন মন্দাভাব। ব্যবসায়ীরা বলছে এ অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনৈতিকভাবে তারা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকূলবর্তী উপজেলা শ্যামনগর, আশাশুনি, দেবহাটা ও কালিগঞ্জের বেশ কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে কুচে ও কাঁকড়ার খামার। চিংড়ী চাষের পাশাপাশি শুধুমাত্র স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভ থাকায় হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকছে কুচে ও কাঁকড়া চাষে।

স্থানীয়ভাবে এসব কাঁকড়া ও কুচে দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া, কালিগঞ্জের উজিরপুর, কালিবাড়ি, শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ বাজারে ডিপোগুলোতে বিক্রি হয়। এখান থেকে ডিপো মালিকরা কনটেইনারের মাধ্যমে ঢাকায় চলে যায় এগুলো। সেখান থেকে সরাসরি বিদেশে রপ্তানি হয়ে থাকে।

চীনে করোনাভাইরাসে মানুষ মারা যাওয়ার কারণে ২৫ জানুয়ারি থেকে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ স্থানীয় বাজারগুলোতেও কুচে-কাঁকড়া কেনা-বেচায় চরম ধ্বস নামছে। আগে যে কাঁকড়া প্রতি কেজি বিক্রি হতো ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৪ টাকায়।

জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে ৩১০ দশমিক ৯ হেক্টর জমিতে কাঁকড়া চাষ হয় সাতক্ষীরায়। ওই জমি থেকে দু’হাজার ১৯০ মেট্রিকটন ও সুন্দরবন থেকে এক হাজার ১০৯ মেট্রিকটন কাঁকড়া সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে কুচিয়া উৎপাদন হয় ৩৫০ মেট্রিকটন।

সাতক্ষীরা কাঁকড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জানান, করোনাভাইরাসের প্রভাবে কাঁকড়া-কুচিয়া রপ্তানি চীনে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প পরিমাণ কাঁকড়া যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, ব্যংকক, হংকং, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে। কিন্তু সেখানে দাম দিচ্ছে আর্ধেকেরও কম।

একটি কাঁকড়া পানি থেকে তোলার পর ৭ থেকে ১০ দিন জীবিত থাকতে পারে। যদি ওই সময়ের মধ্যে বিদেশ পাঠানো না যায় তাহলে তা বিক্রির অযোগ্য হয়ে পড়ে। এসব কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে বেকার হয়ে পড়েছেন কাঁকড়া-কুচিয়া সংগ্রহ-লালনপালন ও রপ্তানির সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষ।

এছাড়া রপ্তানিকারকদের কাছে পাওনা টাকা আটকে যাওয়ায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতেও পারছেন না খামারীরা।

প্রতিদিনি ৪ থেকে ৫টন কাঁকড়া রপ্তানি হতো চীনে। কিন্তু সেখানে এখন ২৫ জানুয়ারি থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি বুধবার পর্যন্ত ১৮ দিনে মাত্র ৩ থেকে ৪টন কাঁকড়া রপ্তানীর জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেন, চীন হচ্ছে জীবিত কাঁকড়ার মূল বাজার। করোনাভাইরাসের কারণে চীনে কুচে ও কাঁকড়া রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের প্রায় ১৫০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। চীনে রপ্তানী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই টাকা আদায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে ব্যবসায়ী ও খামারীরা।

তিনি আরো বলেন, আগে যেখানে ১৬০ গ্রাম থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের কাঁকড়া বিক্রি হতো দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায় এখন সেখানে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চীনে কাঁকড়া, কুচে রপ্তানী বন্ধ হওয়ায় মধ্য প্রাচ্যসহ নতুন বাজার খুঁজতে হবে। তা না হলে এ শিল্পকে রক্ষা করা যাবেনা।

রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, দেশে ২০১৯ সালে কাঁকড়া-কুচিয়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১১০০ কোটি টাকা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়লো এ খাত।

বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিলড ফুড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত রপ্তানিকারকের সংখ্যা রয়েছে ২০৪টি। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।

রপ্তানিকারকদের হিসেবে, বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁকড়া-কুচিয়া মজুদ আছে। ১০০ কেজিতে দৈনিক ৫-৭ কেজি কাঁকড়া-কুচিয়া মারা যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে দ্রুত সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম 

উপরে