আপডেট : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ১১:৩৫

সন্ত্রাস রপ্তানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কূটনৈতিক সমর্থন হারাচ্ছে পাকিস্তান

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
সন্ত্রাস রপ্তানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কূটনৈতিক সমর্থন হারাচ্ছে পাকিস্তান
গত ২৪ জানুয়ারি দাভোসে বালুচ রাজনৈতিক ও অধিকার কর্মীদের বিক্ষোভ

সাম্প্রতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে দাভোসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তীব্র প্রতিবাদের মুখে পড়েছিলেন। বিক্ষোভকারীরা বালুচিস্তান এবং সিন্ধু প্রদেশের জনগণের উপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিল। এই দুই প্রদেশে ১৯৪৭ সালে মিলিটারি অপারেশন শুরু করেছিল পাকিস্তান এবং জোরপূর্বক এখনও বেলুচিস্তানকে দখল করে রেখেছে। বালুচিস্তানে নিয়ন্ত্রিত ফোন পরিষেবা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে শীর্ষস্থানে ছিল। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক এনজিও এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলিকে বেলুচিস্তানে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে এবং পাকিস্তান সরকারের এজেন্ডার বিরোধিতা করে এমন সব ধরণের রাজনৈতিক তৎপরতা সেখানে কঠোরভাবে দমন করেছে।

এ কারণে দাভোসে পাকিস্তানের সিন্ধু ও বেলুচিস্তান প্রদেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা বেলুচদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ইমরান খানকে লাল পতাকা প্রদর্শন করছে। তাঁরা ইমরান সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণকারীদের দমন-পীড়ন ও গুম করার অভিযোগ এনেছে।

খবরে বলা হয়েছে, বেলুচিস্তানের লোকেরা চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের (সিপিইসি) এবং চীনের বিরোধিতা করার জন্য তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। সম্প্রতি, পিটিএম (পশতুন তাহাফুজ মুভমেন্ট) –এর নেতা মনজুর পশতুনকে পেশোয়ার থেকে আটক করেছে। তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এদিকে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এই অঞ্চলে সন্ত্রাস রপ্তানিতে তার দেশ যে অগ্রণী ভুমিকা রাখছে সেই স্পষ্ট সত্যকে অস্বীকার করে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী খান দাবি করেছেন যে, পাকিস্তানে কোনও সন্ত্রাসবাদ নেই এবং যেখানে সন্ত্রাস রয়েছে সেখানেই লড়াই করছে পাকিস্তান। পাকিস্তানে যে সন্ত্রাসবাদ সেটা আফগানিস্তান থেকে আসছে। এবং পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের শিকার।

ইমরান সরকার সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ডাবল স্টান্ডার্ড নিয়ে এগুচ্ছে। একদিকে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করছে, অন্যদিকে ভারত ও অন্যান্য দেশকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসবাদী দলগুলিকে মদত দিয়ে চলেছে।

চীনে উইঘুর মুসলিম নিপীড়নের বিষয়ে ইমরান খানকে জিজ্ঞাসা করা হলে, ইমরান খান বলেছিলেন যে, চীনের বিষয়ে তার দেশ কোন মন্তব্য করতে চায় না। চীন তাদের দেশের মুসলিম নাগরিকদের বিষয়ে কী ধরণের আচরণ করবে সেটা একান্তই চীনের নিজস্ব বিষয়। পাকিস্তান অন্য দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। আবার কাশ্মীরের উন্নয়নের তুলনা করতে গিয়ে ইমরান নির্লজ্জভাবে চীনকে রক্ষা করেছেন। চীন দশ লক্ষেরও বেশি উইঘুর মুসলিকে অবৈধভাবে আটকে রাখার চেষ্টা করছে।

পাকিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনে কোনও নতুন বিষয় নয়, কারণ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বারবার এ জাতীয় ঘটনাবলির খবর পাওয়া গেছে। আছিয়া বিবি, আছিয়া নূরীন মামলাটি পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কুখ্যাততার আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আছিয়া বিবি, একজন খ্রিস্টান মহিলা তাকে তার বাড়ি থেকে টেনে নিয়ে যায় পাকিস্তানি পুলিশ এবং একদল বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে মারধর করে। পরে তাকে ব্ল্যাশফেমির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচার চলাকালীন আছিয়া নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করেছেন। তবুও তাকে ২০১০ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আছিয়াকে গ্রেপ্তারের ৯ বছর পর ৩১ অক্টোবর ২০১৮ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আছিয়াকে গ্রেপ্তারের পরে প্রমাণের অভাবে আদালত তাকে খালাস দিয়েছিল। পরে তার মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে হাজার-হাজার মানুষ বিক্ষোভ করলে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট আগের রায়টি বাতিল করে আছিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে হাজার হাজার রক্ষণশীল মুসলমানদের প্রত্যাশা পূরণ করেছে।

আছিয়াকে খালাস দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিক্ষোভকারীরা তার মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল। বিক্ষোভকারীরা রাস্তা অবরোধ করায় পাকিস্তান সরকার রায় পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে বাধ্য হয়। বিক্ষোভকারীরা থানা ঘেরাও করেছিল। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ২০১১ সালে তৎকালীন পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে তার এক দেহরক্ষী মমতাজ কাদরী হত্যা করেছিলেন, পাকিস্তানি জনতা তাকে আল্লাহর দূত উপাধিতে ভূষিত করে এবং তার নামে একটি মাজারও তৈরি করা হয়।

সালমান তাসিরের অপরাধ ছিল তিনি নিরাপরাধ আছিয়া বিবির পক্ষে প্রচার চালাচ্ছিলেন, এবং তাকে মুক্তির দাবি করেছিলেন। সালমান তাসির এমন এক সময়ে আছিয়া বিবির পক্ষে নেমেছিলেন যখন মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে ২০১১ সালে ব্লাসফেমি আইনের সমালোচনা করায় গুলি করে হত্যা করা হয়।

আছিয়া বিবি এখন কানাডায় একটি অজ্ঞাত স্থানে থাকেন, তার জীবন নিয়ে লেখা একটি বইয়ে তিনি পাক কারাগারের অভ্যন্তরে নারকীয় অবস্থা বর্ণনা করেছেন। ২৯ শে জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘এন ফাইন লিবার’ (শেষ অবধি) বইয়ে আছিয়া বিবি তার গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করেছেন, সেখানে কারাগারের অবস্থা সম্পর্কে লিখেছেন, 'কারাগারে তাকে শেকল দিয়ে বন্দী করে রাখা হয়েছিল এবং অন্যান্য বন্দীদের থেক তাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে রাখা হয়েছিল।

পাকিস্তানের দ্বিমূখী চরিত্রের আরেকটি উদাহরণ হল, একদিকে কাশ্মীরের জনগণের সাথে সংহতি প্রদর্শন করা এবং অন্যদিকে এর মাটিতে সন্ত্রাসবাদী দলগুলির মদত দেওয়া। প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করার জন্য 'কাশ্মীর দিবস' পালন করে থাকে। কাশ্মীরিদের চলমান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে প্রাণ হারানো তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা কাশ্মীরি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এই দিবস পালন করা হয়। তৎকালিন বিরোধী দলীয় নেতা ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের আহ্বানে ১৯৯০ সালে প্রথম 'কাশ্মীর দিবস' পালিত হয়। এ সময় শরীফ তাঁর দাবি অনুযায়ী কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদারিত্বের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দেন। এর পর থেকে প্রতি বছর ৫ ফেব্রুয়ারি 'কাশ্মীর দি'বস পালিত হয়। এসময় জিহাদপন্থী ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জঙ্গি দলগুলি কাশ্মীরের তথাকথিত ভারতীয় দখলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, তহবিল সংগ্রহ করে, সমাবেশের আয়োজন করে। এমনকি এদিন পাকিস্তান সরকার প্রকাশ্যে কাশ্মীরিদের সমর্থনে র‍্যালির আয়োজন করে। আসলে জঙ্গি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আন্তর্জাতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার তাদের প্রকাশ্যে উৎসাহিত করে। এদিন অনেক জঙ্গি প্রকাশ্যে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করে এবং ৫ ই ফেব্রুয়ারিকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করে। ভারতের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে, এবং উগ্রবাদী বক্তব্য প্রদান করে।

এদিন প্রকাশ্যে রাস্তায় নামে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন হিসেবে চিহ্ণিত জয়স-ই-মোহাম্মদ প্রধান মাওলানা মাসুদ আজহার এবং লস্কর-ই-তৈয়েবা প্রধান হাফিজ সাঈদ। বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী হিসাবে তাদের চিহ্ণিত করা হয়েছে। লস্কর-ই-তৈয়েবা প্রধান হাফিজ সাঈদ ২৬/১১ তে মুম্বাইয় হামলার মূল পরিকল্পনাকারী। 'কাশ্মীর দিবসে' বিভিন্ন সমাবেশে তাদের সশস্ত্র জিহাদের আহ্বান জানাতে দেখা গেছে। এদিন রাজনৈতিক দলগুলোর মতো রাস্তায় নামে দিফাই-ই-পাকিস্তান, জামায়াত উদ দওয়াসহ ৪০ টিরও বেশি জঙ্গি সংগঠন। সিপাহ-এ সাহিবা, হরকাত ইউ এল মুজাহিদিন এবং সাঈদ সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে পাকিস্তান ভিত্তিক ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল কাশ্মীর সংহতি দিবসে প্রকাশ্যে তহবিল সংগ্রহ করে।

এটা গোপন কোন বিষয় নয় যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিয়মিত বিএসএফ এবং ভারতীয় সেনা পোস্টকে লক্ষ্যবস্তু করে লাইন অব কন্ট্রোল এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে পাক ভিত্তিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর ক্যাডারদের নিয়মিত মোতায়েন করে রাখে। এলইটি, জেএম, আল-বদরসহ বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী দলের পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত মুজাফফারাবাদে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প রয়েছে। সেখানে ফিদায়ী (আত্মঘাতি) ট্রেনিং দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে বালাকোটে জাইশ-ই-মোহাম্মদের (জেএম) ঘাটিতে ভারতের এয়ার স্ট্রাইকে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট ভাবে উঠে আসে। সেখানে বেশ কয়েকটি জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির গুড়িয়ে দেয় ভারতীয় বিমানবাহিনী।

বিশ্ব সম্প্রদায় আজ পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসাবে দেখছে। ফলস্বরূপ, পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান ভাবে নিজেকে অন্ধকার পথের শেষ প্রান্তে দেখতে পাচ্ছে। সন্ত্রাসে তহবিল যোগান দেওয়ার সাথে যুক্ত হওয়ার অভিযোগে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে আন্তর্জাতিক ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ)। গত বছর এফএটিএফ এর পূর্ণাঙ্গ বৈঠকের সময়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তান দ্বারা সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি মোকাবেলায় সামগ্রিক অগ্রগতির অভাব নিয়ে বেশ গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। পাকিস্তান একটি বিপজ্জনক পথে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন এফএটিএফ এর সভায় বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা হবে। সেখানে সন্ত্রাসে পাক অর্থায়ন বন্ধের সুস্পষ্ট বিশ্বাসযোগ্য কোন কারণ দেখতে না পেলে পাকিস্তানকে কালো তালিকাভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সত্যিই এমন কিছু হয়, তাহলে ভঙ্গুর অর্থনীতির পাকিস্তানকে একেবারে খাঁদের কিনারে নিয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে