আপডেট : ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ ২১:৫৮

দরজায় ভারত-চীনের অতিথী; কাকে বসতে দেবে নেপাল?

অনলাইন ডেস্ক
দরজায় ভারত-চীনের অতিথী; কাকে বসতে দেবে নেপাল?

কাঠমান্ডু এখন যেমন ব্যস্ত গত বছর তেমনটি ছিল না। হঠাৎ করেই দেশটি দক্ষিণ ও উত্তরের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের স্বাগত জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

শুক্রবার ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে স্বাগত জানানোর পরপরই তারা রোববার চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়ে ফেঙ্গিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিতে থাকে।

পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় শনিবার ঘোষণা করে, ওয়ে দিনব্যাপী সফরে রোববার (২৯ নভেম্বর) আসছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, কাঠমান্ডুতে দিনব্যাপী সফরে ওয়ে প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলির সাথে সাক্ষাত করবেন। উল্লেখ্য, নেপালের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও বর্তমানে ওলির হাতে। এছাড়া ওয়ে নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবি ভান্ডারি, নেপাল সেনাপ্রধান জেনারেল পূর্ণ চন্দ্র থাপার সাথেও সাক্ষাত করবেন।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এক মাস বন্ধ থাকার পর নেপালে ভূরাজনৈতিক খেলা আবার শুরু হয়েছে। আর কাঠমান্ডুর নেতারা যদি নেতৃত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারেন, তবে দেশটি বিদেশী শক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।

সেন্টার ফর নেপাল অ্যান্ড সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক মৃগেন্দ্র বাহাদুর কারকি বলেন, চীন মনে হয় কাঠমান্ডুতে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হারিয়ে ফেলছে। কারণ নেপালিদের সংস্কৃতি, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে নেপাল অনেকটাই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ। তিনি বলেন, ভারত এখন তার পুরনো প্রভাব-বলয় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, আমেরিকানরা ভারতীয় লেন্স দিয়েই দেখছে।

গত বছরের অক্টোবরে কাঠমান্ডুতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের পর উত্তর থেকে আর কোনো উচ্চপর্যায়ের সফর না হলেও দেশটির কাঠমান্ডুর মিশন নেপালি রাজনীতিতে সক্রিয়। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনা করা যায়, সঙ্কটের সৃষ্টি হলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়ো ইয়ানকির বৈঠকের বিষয়টি।

চীন অনেক বেশি সক্রিয় হওয়ার প্রেক্ষাপটে নেপালের উত্তর-পশ্চিম দিকের বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড নিয়ে কাঠমান্ডু ও দিল্লী মানচিত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই কাঠমান্ডুর সাথে সম্পর্ক ঝালাই করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে দিল্লী। তারা পরপর কিছু প্রয়াস গ্রহণ করেছে। দশাইন উৎসবের ঠিক আগে দিয়ে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ওলির সাথে সাক্ষাত করেন ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার (র) প্রধান। এরপর চলতি মাসের প্রথম দিকে কাঠমান্ডু সফর করেন ভারতীয় সেনাপ্রধান এম এম নারাভানে। কয়েক সপ্তাহ পর ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সফর করে গেলেন নেপাল।

দিল্লী থেকে আসা বার্তা পরিষ্কার: তারা কাঠমান্ডুর সাথে সম্পক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়।

শ্রিংলা কাঠমান্ডু পৌঁছেই মন্ত্রমুগ্ধ আক্রমণ শুরু করেন। তিনি নেপাল ও ভারতকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তিনি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে কাঠমান্ডু এসেছেন। তার ভাষাগত কূটনীতিক পুরোপুরি প্রকাশ পায় যখন তিনি নেপালিতে কথা বলতে শুরু করেন।

ভারত ২০১৫ সালে নেপালের সংবিধান নিয়ে বিরোধের জের ধরে ৫ মাসের অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পর নয়া দিল্লীর এস্টাবলিশমেন্টের মধ্য ধারণা সৃষ্টি হয় যে তারা কাঠমান্ডু খুইয়ে ফেলেছেন।

আবার ওলি ক্ষমতায় আসেন ভারতবিরোধী বক্তব্য নিয়ে। আর তা দিল্লীর কাছে ভালো লাগেনি।

কালাপানি এলাকা ভারতের মধ্য দেখানো ও লিপুলেখ হয়ে একটি রোড লিঙ্ক নির্মাণের ফলে দিল্লীর সাথে সম্পর্কের আরেক দফা অবনতি ঘটে কাঠমান্ডুর।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কাঠমান্ডুতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কারণে অস্বস্তিতে পড়ে যায় ভারত।

কাঠমান্ডুর পররাষ্ট্র নীতিবিষয়ক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ভারত এখন নেপালের সাথে তার সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে। তবে বেইজিংও পিছিয়ে পড়তে রাজি নয়।

রাজনৈতিক ভাষ্যকার চন্দ্র দেব ভট্ট বলেন, বিদেশী শক্তিগুলো সবসময়ই নেপালে তাদের প্রভাব বাড়াতে চায়। আর ঘরোয়া উপাদানগুলোও তাদেরকে ওই সুযোগ দিয়ে থাকে।

ভট্ট বলেন, আমরা স্বীকার করি বা না-করি, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির ঐক্য নিয়ে চীন বেশ উদ্বিগ্ন। আদর্শগত কারণে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি নেপাল কমিউনিস্ট পার্টিকে ভ্রাতৃপ্রতীম মনে করে।

এদিকে ওলির কাছের লোকজন মনে করছে, ওলি ইতোমধ্যেই দলবদল করেছেন, তিনি দিল্লীর সাথে থাকতে রাজি হয়ে গেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেপাল সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ওয়ে দুই দশকের মধ্যে নেপাল সফরকারী দ্বিতীয় চীনা প্রতিরক্ষমন্ত্রী। তার আগে ২০১৭ সালের ২৩ মে ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে তিন দিনের সফরে নেপাল গিয়েছিলেন চ্যাঙ ওয়ানকুয়ান। আর ১৬ বছরের মধ্যে ওটা ছিল নেপালে কোনো চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রথম সফর।

ভট্ট বলেন, চীন এখন কোনোভাবেই চাইবে না, নেপাল তাদের হাত থেকে ফসকে ভারতের হাতে চলে যাক।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।

আবার যুক্তরাষ্ট্রও সামনে আসছে। তারা মিলিনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোশেনের মাধ্যমে নেপালকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার দিতে চায়। কিন্তু নেপাল আবার চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সই করে রেখেছে। নেপাল যাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব গ্রহণ না করে সে ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে চীন।

উপরে