আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২১:৫৬
পাকিস্তান-চায়না

বন্ধুত্বে বৈরী বাতাস

অনলাইন ডেস্ক
বন্ধুত্বে বৈরী বাতাস

চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং আকস্মিকভাবে পাকিস্তান সফর বাতিল করলেও দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এটি ছিল বহুল প্রত্যাশিত খবর । করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রেসিডেন্টের পাকিস্তান বাতিল বলা হলেও এর পেছনে চীন পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের প্রধান লে. জেনারেল অসীম সালিম বাজওয়ার দূর্নীতি ও কেলেংকারি যুক্ত ছিল সেটা দেশটির শীর্ষমহল আগে থেকেই ধারণা করে রেখেছিল। বাজওয়ার বিরুদ্ধে তার স্ত্রী ও পুত্রদের সাথে যুক্ত বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ও সম্পদ প্রকাশ না করার অভিযোগ রয়েছে। তিনি একধারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শীর্ষ সহযোগী এবং সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সবচেয়ে কাছের লোক হিসেবে পরিচিত। এ নিয়ে দু দেশের সম্পর্কের মধ্যে বৈরি বাতাস বইছে। এ বিষয়ে গ্রেট ওয়াল যে ক্ষুব্ধ সেটা তারা প্রকাশ করেছে।

যেভাবে সিপিইসির মাধ্যমে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সম্পদ কুক্ষিগত করার পরিকল্পনা করেছিলেন তা ধীরে ধীরে জনরোষ বাড়াতে সাহিয্য করেছে যা নিয়ে নাখোশ গ্রেটওয়াল। তারা দেখতে পেয়েছেন শীর্ষস্থানীয় সেনা এবং রাজনীতিবিদদের জন্য সিপিইসি ক্রমশ দুর্নীতির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে | পাকিস্তানের টালমাটাল রাজনীতির অংশ হয়েও উঠছে প্রকল্পটি। এ নিয়ে বেজায় চটেছেন জিনপিং। এভাবে চলতে থাকলে একসময়ে পাকিস্তানে চীনার আধিপাত্য ক্ষুন্ন হতে পারে এ শংকা কাজ করছে গ্রেটওয়ালেও। বিশ্লেষকদের মতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লাগামহীন দূর্নীতির কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে চীনা বিনিয়োগ। ভেস্তে যেতে পারে চীনের পরিকল্পনা।  যে কারণেই চীন বেশ উদ্বীগ্ন। এই বিনিয়োগ ঝুঁকিই পরবর্তিতে নিরাপত্তা ঝুঁকিঁতে পরিনত হতে পারে। যেকারণেই গ্রেটওয়াল আগাম সতর্কতা হিসেবে চোখ গরম করছে পাকিস্তানের প্রতি। আর অবনত চিত্তে পরিস্থিতি সামলাতে প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন ইমরান খান। বরাবারের মত এ দৌড়ে তার সঙ্গী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া। সব কিছু চলছিল ঠিকঠাকই। আচমকাই চীনের পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্ত আসতে পারে তা কখনই ভাবতে পারেননি ইমরান খান।  শি জিনপিংএর  সফরে পাকিস্তানের নানা বিষয়ে চীনা সাহায্যের আশ্বাস নির্ভর করছিল। স্বয়ং ইমরান খান চীনা রাষ্ট্রপতিকে নিজে গিয়ে আমন্ত্রণ জানানোর পরও, জিনপিং-এর সিদ্ধান্ত পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সব আশায় জল ঢেলে গেল।

গত জুন মাসে সফর পিছনোর পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তান সফর করার কথা ছিল জিনপিংয়ের। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে জল্পনা উসকে ইসলামাবাদে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও জিং জানিয়েছেন, করোনা মহামারীর কথা মাথায় রেখে আপাতত পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি আরও জানান, যৌথভাবেই ভাইরাসটির সঙ্গে লড়াই চলবে দুই দেশ। যদিও তাঁর এই কথা পরিস্থিতি সামাল দিতে কূটনৈতিক বুলি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এই চিন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর নিয়ে এতদিন অবশ্য বেজায় উৎফুল্ল ছিল ইসলামাবাদ। এতদিন তারা ভাবছিল, এতে দারুন লাভবান হবে পাক অর্থনীতি। যদিও সম্প্রতি তাদের সেই ভুল ভেঙেছে। নিজেদের প্রকৃতির ক্ষতি করে চিনকে বেশ কিছু রাস্তা বানাতে দিচ্ছে না পাক সেনা।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের উচ্চভিলাসী ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পের পাকিস্তান অংশে সিপিইসি হচ্ছে শি জিনপি ‘র প্রধানতম অংশ। যা আরব সাগরকে গওদর পোর্টের মাধ্যমে যুক্ত করবে চীনকে। সিপিইসি প্রকল্পে পাকিস্তানের বাণিজ্যিক বা আর্থিক কোনও লাভই সেই অর্থে নেই। বরং ওই পথে সস্তার চিনা পণ্যে ছেয়ে যাচ্ছে পাক বাজার। মার খাচ্ছে স্থানীয় কারবারিরা। পাশাপাশি, ওই প্রকল্পের অন্তর্গত নির্মাণকাজে নিজের দেশ থেকে শ্রমিক এনে কাজ করাচ্ছে চিন। ফলে পাকিস্তানিদের কাজের সুযোগ মিলছে না। বিশেষ করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে এ নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কিন্তু পাক শাসকরা চিনা পুঁজির লোভে এই প্রকল্পে সায় দিয়েছেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, সিপিইসি প্রকল্পের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিম বাজওয়ার বিরুদ্ধে লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে কয়েকদিন আগেই ইমরান খানের উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন তিনি।  বিশ্লেষকদের মতে সিপিইসিতে  চীনা নেতৃত্ব এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্য আলাদা নয়। তারা উভয়ই গণতান্ত্রিক কাঠামোকে বাদ দিয়ে নীজ নীজ সাম্রাজ্য বিকাশের জন্য পাকিস্তানের  সম্পদ কাজে লাগাতে চায়।

২০১৫ সালে বহু বিলিয়ন ডলারের সিপিসি শুরু হওয়ার পরে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চোখ ছিল এখান থেকে অর্থ ও সম্পদ কুক্ষিগত করা। যে কারণে সেনাবাহিনি সিপিইসি কর্তৃপক্ষ বিল 2020 অনুমোদন দিতে ইমরান খানের ওপর চাপ সৃস্টি করে এসেছিল। এটা ছিল আসলে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মাধ্যমে করিডোরটি দখল করা। যা সিপিসি প্রকল্পের চারপাশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াটিতে সরাসরি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার দীর্ঘ চীনা ইচ্ছা পূরণ করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে গণঅসন্তোষ বাড়তে শুরু করেছে সিপিইসি প্রকল্পের আওতাভূক্ত এলাকায়। শুধু এখানেই নয়, পকল্পের অন্তভূক্ত আজাদ কাশ্মিরের জনগনও চটেছেন বেশ । সম্প্রতি এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে সংশ্লিষ্ট এলাকার নীলম ও ঝিলাম নদীর উপর দুটি মেগা বাঁধ নির্মাণ নিয়ে মুজফফরাবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। গত জুলাই মাসে বাহওয়ালপুর জেলায় চীনা শ্রমিক ও পাকিস্তানি প্রহরীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।  পাকিস্তানের জেলেরা সিন্ধু ও বালুচিস্তান প্রদেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাছ ধরার জন্য ২০ টি চীনা গভীর সমুদ্রের ট্রলারের আগমনের বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ করেছে।

সিপিইসি নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিবাদ, দুর্নীতি ও সংঘর্ষের ঘটনা পাকিস্তানের চীনা প্রকল্প এবং কর্মীরা চীনা নেতৃত্বের জন্য অনুকুলে নয়। যে কারণে শি’র মনে হয়েছে তার পাকিস্তান সফরের ফ্লাইটটি  নীজের ঘনিষ্ট হিসেবে পরিচিত পাকিস্তানের আকাশে এক বৈরী আবহাওয়ার মুখোমুখি হতে পারে। এমনিতেই করোনা পারিস্থিতি নিয়ে নাজুক অবস্থায় আছেন শি। তারপর প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে দন্দ। তারপরে নিজ বন্ধু রাষ্ট্রের কাছে যদি কোন অনাকাঙ্খিত পারিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় সে নিয়ে বেশ সতর্ক চীনের প্রেসিডেন্ট।

উপরে