আপডেট : ১৬ আগস্ট, ২০২০ ০০:৩১

বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা

ষ্টাফ রিপোর্টার
বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে কক্ষচ্যুত হয় বাংলাদেশ তার জন্মের আদর্শ থেকে, মূলনীতি থেকেও। বলতে গেলে সেদিন থেকেই বাংলাদেশের উল্টোযাত্রা শুরু। সেই উল্টোযাত্রা আজও চলছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার এই উল্টোযাত্রা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে উদ্ধার করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যদিও তাঁর চারদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা ওৎ পেতে বসে আছে সারাক্ষন। লক্ষ্য তাদের একটাই কিভাবে আরেকটা ১৫ আগস্ট ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে চিরতরে কবর দেওয়া যায়।

পাকিস্তানে বন্দি থাকাকালীন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার নকশা চুড়ান্ত করেও পাকিস্তানীরা তা করতে পারে নি। এমনকি কারাগারের যে সেলে তিনি থাকতেন তার পাশে একটি কবরও খুড়ে রেখেছিল পাকিস্তানের সামরিকজান্তারা। সামরিক আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার মত তাদের সেই সাহস ছিল না; যা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট দেখিয়েছিল পাকিস্তানের আর্শিবাদপুষ্ট বাংলাদেশেরই  কিছু মানুষ। এদেশের  কিছু বিপথগামী সৈনিকদের কথা বলা হলেও এর পেছনে স্বাধীনতাবিরোধি বড় একটি কুচক্রি মহল তৎপর ছিল যা গত বছর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বর্ষিয়ান আওয়ামি লীগ নেতা ও বঙ্গবন্ধুর এক সময়কার ঘণিষ্ঠ সহচর তোফায়েল আহমেদ স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পেছনে শুধু কয়েকজন সৈনিক নয়; এর পেছনে অনেক অপশক্তির হাত ছিল। এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা দরকার।’ বর্তমানে ওই শক্তিটি ডালাপালা বিস্তার করেছে অনেক। তারাই সর্বদাই ষড়যন্ত্র করছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের সেই রাতে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের নির্মম হত্যাকান্ডের সঙ্গে সঙ্গেই যে আঘাতটি আসে তা হলো এদেশের  ধর্ম নিরেপক্ষতার উপর। সেইদিন থেকেই উত্থান হয় মৌলবাদের; বিকাশ হয় ধর্মভিত্তিক রাজনীতির। প্রমাণ মেলে রক্তাক্ত সে ভোরে ইথারে ভেসে আসা মেজর ডালিমের দম্ভোক্তি থেকেই।

‘আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরাচারি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। জননেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করেছে। দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে এবং সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ এখন থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র।’ আর সেই দিন থেকে শুরু হয় এই দেশটির উল্টোযাত্রা। মুখ থুবড়ে পরে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে খুনি মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল পাকিস্তান এবং সেখানেও বাংলাদেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো শুধু ভ্রাতৃপ্রতীম খন্দকার মোশতাক আহমেদের সরকারকে স্বীকৃতিই দিলেন না, একই সঙ্গে তিনি ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সব সদস্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের প্রতি নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানালেন। সৌদি আরবসহ অনন্য মুসলিমদেশগুলোর কাছে বললেন বাংলাদেশ এখন আর গণপ্রজাতন্ত্র নয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র।

সেবছর ২৮ আগস্ট গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ আগস্টের ঘটনার ভেতর দিয়ে যেন বাংলাদেশের জনগণ আইয়ুবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় প্রচারণা এবং সামরিক শাসনকাল প্রত্যাবর্তন করেছে।

বাহাত্তরের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর প্রথম গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্য। লন্ডন থেকে দিল্লির পথে তার সফরসঙ্গী হয়েছিলেন লন্ডনে নিযুক্ত ভারতের একজন কূটনীতিক। শশাঙ্ক এস ব্যনার্জি তার নাম। যুক্তরাজ্যের বিমান বাহিনীর একটি নিজস্ব বিমানে তারা পাশাপাশি বসে লন্ডন থেকে দিল্লি এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। ‘ইন্ডিয়া, মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশ লিবারেশন অ্যন্ড পাকিস্তান’ নামে ২০১১ সালে তার একটি বই প্রকাশিত হয় যুক্তরাষ্ট থেকে। বইয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পাকিস্তানের নীল নকশার কিছু অংশ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ওই বইয়ে তিনি লিখেছিলেন, মূলত ভারতের সহায়তা নিয়ে পাকিস্তানকে ভাঙার অপরাধে বঙ্গবন্ধুকে চরম শাস্তি দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল পাকিস্তানী শাসকরা। পাকিস্তানের সামরিক আদালত বিচার করে মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃতুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং সে রায় তাঁর কাছে হস্তান্তরও করা হয়েছিল। মুজিবের ফাঁসির রায়ে কারাকর্মকর্তাদের মাঝে দানবীয় উল্লাস ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁর (মুজিব) প্রিজন সেলের ভেতর সাড়ে ছয় ফুট লম্বা কবর খনন করে এর উপরের দিকে একটি দড়ি ঝুলিয়ে রেখেছিল। এটা হচ্ছে ওয়ার্নিং; যেকোনো সময় তার হত্যা কার্যকর হতে পারে। তবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর একান্ত প্রচেষ্টায় পাকিস্তান সে যাত্রায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারেনি পাকিস্তান।

শশাঙ্ক এস ব্যনার্জি ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ দ্য ওয়্যার নামে একটি অনলাইনে ‘মুক্তিযদ্ধের পর পাকিস্তানি ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ভারতীয় সিদ্ধান্তের নেপথ্যের গল্প’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেন। এতে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি একাত্তরে শেখ মুজিবের মৃতুদণ্ড কার্যকর করতো তবে বাংলাদেশ পরিণত হত একটি এতিম রাষ্ট্রে। তা হতো মিসেস গান্ধীর জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন। ’  ভারত মনে-প্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে। যুদ্ধে হেরে যাওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তান যদি শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে ফেলে সেটা হত ভারতের জন্য অকল্পনীয় বিপর্যয়। একটি স্বপ্নভঙ্গ। কাজেই মুজিবের স্বার্থে, তার পরিবারের স্বার্থে, বাংলাদেশের স্বার্থে এবং নিজের স্বার্থে তাঁর জীবন রক্ষা করতে ভারত সম্ভাব্য সব চেষ্টাই চালিয়ে গেছে। এরই অংশ হিসেবে যুদ্ধবন্দি ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈনিকের বিনিময়ে জীবিত মুজিবুর রহমানকে ফেরত পেতে বদ্ধ পরিকর ছিল ইন্দিরা গান্ধি। প্রস্তাব পাঠানো হয় জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে ভুট্টো তখন যুক্তরাষ্ট্রে। যুদ্ধের শেষ ডামাডোলের মধ্যেই ভুট্টোর কাছে খবর যায়, জেনারেল ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করেছেন। তাকে (ভূট্টোকে) সামরিক আইনের প্রধান প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়েছে। তাকে তড়িঘড়ি দেশে ফিরতে বলা হয়। ভারতের গোয়েন্দারা জানতো লাহোর ফেরার পথে ভুট্টো লন্ডনে ট্রানজিট নেবেন। সেখানেই ভারতের হয়ে একজন প্রতিনিধির মাধ্যমে ভূট্টোকে জানানো হয় ইন্দিরা গান্ধির প্রস্তাব। সে সময়  শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়া ছাড়া ভুট্টোর হাতেও কোন বিকল্প কিছু ছিল না। দেশে ফিরে কৃত্রিম এক ভ‚-রাজনৈতিক উদারতায় ভুট্টো রাওয়ালপিন্ডির সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির রায় নাকচ করে দিলেন। বলা যায়, দিতে বাধ্য হলেন। ৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিল পাকিস্তান। ফিরে এসে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ মুজিব বাংলাদেশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের জাতির পিতা মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষার বিনিময় হিসেবে, তার মুক্তির ৮ মাস পর ভারত ২ আগস্ট ১৯৭২-ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। সে অনুযায়ী, পরবর্তিতে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ফিরিয়ে দেয় ভারত। যদিও সে সময়ে নিজ দেশে ব্যপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধি। সে সময়ে বিরোধী দলগুলোর প্রস্তাব ছিল এই যুদ্ধবন্দিদের ট্রাম্পকার্ড করে ভারত কাশ্মির ইস্যুর একটি সমাধান করা। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধি এসবে কর্ণপাত করেন নি। তার চেষ্টা ছিল যে কোন কিছুর বিনিময়ে জীবিত বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে আনা।
ভারতের কাছে এ পরাজয় পাকিস্তানের জাতিসত্তার জন্য ভয়াবহ অপমান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইলো ঘটনাটি। কেবল পরাজয় নয়, তার চেয়েও মারাত্মক  হল পাকিস্তানের  অর্ধেক রাজত্ব চলে গেল বাংলাদেশের কাছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার যে আদর্শগত তত্ত¡, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত¡, তা ভেঙে খান খান হয়ে গেল। এ ধ্বংসযজ্ঞের দহনে দগ্ধ পাকিস্তানি শাসকদের একটাই লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে হত্যা করা।

বিষয়টি নিয়ে ভারত থেকে অন্ততপক্ষে কয়েক দফায় সতর্ক করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। জানানো হয়েছিল তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তা শোনেন নি। তার কথা ছিল একটাই; এদেশের সন্তানরা কখনোই এমন কাজ করতে পারে না।

পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তির মাত্র তিন বছর আট মাস পর ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে  অ্যাবোটাবাদে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাংলোদেশের সেনা অফিসারদেরই একটি ব্যাচ, যারা তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে জ্যেষ্ঠ পদ অধিষ্টিত ছিল,  তারা  নির্মমভাবে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। মাত্র চার  বছরের মাথায় তারা পাকিস্তান সামরিক গোয়েন্দো সংস্থা আইএসআইয়ের অসমাপ্ত এজেন্ডা পূর্ণ করে। ‘

প্রবন্ধটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। বলা হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা ছিল বহুমাত্রিক। পাকিস্তান, আমেরিকা, চীন, সৌদি আরব, জামায়াতে ইসলামি, মুসলিম লীগ, বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থী অংশ এবং উচ্চাভিলাষী সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা এই গর্হিত ঘটনায় সর্ম্পৃক্ত ছিল। প্রত্যেকের ছিল ভিন্ন ভিন্ন এজেন্ডা কিন্তু লক্ষ্য ছিল একটাই- বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে স্বার্থ উদ্ধার হবে, এমন কাউকে বাংলাদেশের সরকারে প্রতিস্থাপন করা। আর এ বিষয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রধান পছন্দ ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমানও  ছিলেন সুযোগ সন্ধানী, একটি ইমপ্যাক্টের  সাফল্য  হস্তগত করতে তার জুড়ি মেলা ভার। ডর প্রমাণ মিলেছে তার এই চরিত্রে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীন সময়ে ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড পরবর্তী ও তার শাসনামলের নানান ঘটনায় সুস্পষ্ট হয়েছে । তাই, একদিকে জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হতে অস্বীকৃতি জানায় এবং অপরদিকে বিদ্রোহে উৎসাহিত করে এবং এই বিষয়ের প্রতিকারে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। মূলতঃ জিয়া দেখতে চেয়েছিল, অস্থির সেই সময়ে পরিস্থিতিতে চুপচাপ বসে থাকা। কারণ তিনি জানতেন সবকিছুই সেসময়ে তার নিয়ন্ত্রেণে আসবে একদা।

জিয়ার শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সহ সরকারী উচ্চ পদে বহাল করেছিল; এ সবই প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়াউর রহমান একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং ক্ষমতালোভী চক্রের সরকার ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক আদেশে দালাল আইন বাতিল করে দেয়। এর ফলে সব যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার এবং অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। শহীদদের রক্তাক্ত বাংলাদেশে বুক ফুলিয়ে চলতে শুরু করে রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর সদস্যরা।

জিয়াউর রহমান কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে সকল ক্ষমতা গ্রহণ করার পরদিনই সরকার এক অধ্যাদেশ জারি করে বাহাত্তরের সংবিধানের চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে আদর্শিক পরিবর্তন আনে। সংবিধানের শিরোনামে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম লিপিবদ্ধ করা হয়। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এর পরিবর্তে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার কথাগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়। এ অধ্যাদেশের ফলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের  সকল মানুষের সমান অধিকার এবং অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খায় এক প্রচন্ড ধাক্কা লাগে।

১ মে ১৯৭৬ ঢাকায় এক শ্রমিক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে  মানুষকে অবাধে ধর্ম পালন করতে দেয়া হয়নি। তার ঠিক কিছুদিন পর ৩ মে ১৯৭৬ সরকার এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জেনারেল জিয়া সংবিধানের ৯ম সংশোধনীর মাধ্যমে তা আইনে পরিণত করেন। এর ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ আরওসব  ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল  তৎপরতা শুরু করে। রাষ্ট্র-সমাজ আর রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর সদস্যরা। বাংলাদেশের মাটিতে ধর্মীয় অপশক্তির নবজাগরণ ঘটে। এই অপশক্তির উত্থান আজও বাংলাদেশকে গুনতে হচ্ছে রক্ত সংঘাত আর হানাহানি মোকাবেলার মধ্য দিয়ে।

 

উপরে